ঘোষ গ্রামে মা লক্ষ্মীই আরাধ্যদেবী তাই গ্রামের কোনো বাড়িতে আলাদা করে মা লক্ষ্মীর পুজো হয় না

0
67

পারমিতা মণ্ডল, রামপুরহাট, ৯ অক্টোবরঃ লক্ষ্মীর গ্রাম ঘোষ গ্রাম। মা লক্ষ্মী গ্রামে বিরাজ করেন তাই ঘোষ গ্রামকে অনেকে লক্ষ্মী গ্রাম বলে জানেন। গ্রামে মা লক্ষ্মীই আরাধ্যদেবী। তাই গ্রামের কোন বাড়িতে আলাদা করে মা লক্ষ্মীর পুজো হয় না। সন্ধ্যা শুরু হতেই গ্রামের মানুষ লক্ষ্মী মন্দিরে পুজো দিয়ে প্রসাদ গ্রহণ করে উপবাস ভাঙ্গেন। প্রাচীন কাল থেকে এই রীতি চলে আসছে। আজও তাঁর কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি। কবে মা লক্ষ্মী গ্রামে অধিষ্ঠিতা হয়েছিলেন তার দিনক্ষণ সঠিকভাবে কেউ বলতে পারেন না। তবে মনে করা হচ্ছে হর্ষবর্ধনের আমলে কামদেব ব্রহ্মচারী নামে একজন সাধক এই ঘোষ গ্রামে এসেছিলেন মা লক্ষ্মীর সাধনার সন্ধানে। বীরভূমের রাঢ় অঞ্চলে ঘুরতে ঘুরতে তিনি ময়ূরেশ্বর ১ নম্বর ব্লকের একচক্রধাম বীরচন্দ্রপুর গর্ভবাসে পৌঁছন। জানা যায়, ভরা বর্ষায় নদী সাঁতরে তিনি ঘোষ গ্রামে পৌঁছেছিলেন। রাত্রি হয়ে যাওয়ায় তিনি একটি নিম গাছের নিচে বসে ঘুমিয়ে পড়েন। পরে ঘোষগ্রামের ওই নিম গাছের তলায়তেই সাধনা শুরু করেন বলে কথিত আছে। দীর্ঘ দিন কঠোর সাধনা করার পর তিনি মা লক্ষ্মীর স্বপ্নাদেশ পান। কথিত আছে, তাঁকে মা লক্ষ্মী স্বপ্ন দিয়ে বলেছিলেন, ‘যেখানে তুই সাধনা করছিস সেখানে  মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পুজোর ব্যবস্থা কর। ‘ এই কাজে তাঁকে  সাহায্য করেন গ্রামের কৃষিজীবী সজল ঘোষ। একদিন কৃষি কাজে ওই কৃষক মাঠে গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর ছেলে দয়াল ঘোষ ওরফে হলধর। দয়াল ঘোষ  কৃষি কাজে ব্যস্ত হয়ে পরেন। এমন সময় একটি শ্বেতপদ্ম পাশের একটি কাঁদরে ভাসতে দেখে ফুল তোলার জন্য বাবার কাছে তিনি বায়না ধরেন। ছেলের বায়না রাখতে দয়াল ঘোষ শ্বেত পদ্মটি তুলতে গেলে সেটি বারবার সরে যায়। ব্যর্থ হয়ে তিনি বাড়ি ফিরে যান। এরপর রাতে তিনিও স্বপ্ন পান, কোনও সাধক পুরুষই শ্বেতপদ্ম তুলতে পারবেন। এরপর ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে গ্রামে আশ্রয় নেওয়া কামদেব ব্রহ্মচারীর কাছে ছুটে যান তারা। সেদিন ছিল কোজাগরী পূর্ণিমা তিথি। ব্রহ্মচারী দয়াল ঘোষকে সঙ্গে নিয়ে জলাশয় থেকে সেই শ্বেতপদ্ম ও ভাসমান নিম কাষ্ঠখন্ড তুলে নিয়ে এসে গঙ্গার মাটির রঙ দিয়ে লক্ষ্মীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে পুজো শুরু করেছিলেন। সেই দিনটি ছিল কোজাগরী পূর্ণিমা। সেই সময় থেকে আজও ঘোষগ্রামে মহাধুমধামে মা লক্ষ্মীর পুজিতা হয়ে আসছেন। জানা গিয়েছে, মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দির রাজা কৃষ্ণচন্দ্র খবর পেয়ে গ্রামের মা লক্ষীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর রাতে ৯ টি ঘট ভরে নবঘটের পুজো করা হয়। ১০৮ টি ক্ষীরের নাড়ুর নৈবেদ্য দেওয়া হয়। লক্ষ্মী পুজোর দিন সকাল থেকেই দূরদূরান্তের মানুষ ভিড় করেন ঘোষগ্রামে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মুর্শিদাবাদের আন্দি গ্রামের বাসিন্দা লক্ষ্মী ঘোষ বলেন, “প্রায় ৪০ বছর ধরে এই গ্রামে আসছি। মা প্রতি বছর আমাকে এখানে টানেন। তাই সমস্ত বাধা অতিক্রম করে এই দিনটিতে এখানে পৌঁছে যায়। মন্দিরের সেবাইত নন্দ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “লক্ষ্মী পুজো উপলক্ষে সারাদিন এখানে পুজো হয়। দিনের বেলা দূরদূরান্তের মানুষ এসে পুজো দিয়ে যান। সন্ধ্যাতে গ্রামের মানুষ পুজো দেন। প্রসাদ গ্রহণ করেন”। এদিন সন্ধ্যায় মা লক্ষ্মীর উদ্দেশ্যে এখানে হোম যজ্ঞ করেন সেবাইত গুরুশরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “বিশ্ব শান্তির পাশাপাশি আমাদের দেশ ধনসম্পত্তিতে ভরে উঠুক এই কামনা করে যজ্ঞ করলাম। মা লক্ষ্মীর কাছে কামনা করলাম দেশের মানুষ যেন দুবেলা দুমুঠো অন্ন খেতে পায়”।

LEAVE A REPLY