পুরুলিয়া জেলার জন্ম ও বঙ্গ ভুক্তি দিবস পালন

0
32

সাথী প্রামানিক,পুরুলিয়াঃ  ঢাকঢোল না পিটিয়েই ৬৭ তম বর্ষে পদার্পন করল পুরুলিয়া জেলা। ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন বিহার রাজ্যের মানভূম জেলার ষোলোটি থানা নিয়ে পৃথক পুরুলিয়া জেলা হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। সেই ইতিহাসকে মনে রেখে পুরুলিয়া জেলার জন্মদিন পালন করে লোকসেবক সংঘ। পুরুলিয়ার ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎদের প্রতিকৃতিতে মালা দিয়ে সম্মান জানানো হয়। এছাড়াও লোক সেবক সংঘের তরফ থেকে একটি মিছিল করা হয়। পুরুলিয়া শহরের তেলকল পাড়া এলাকায় অবস্থিত শিল্পাশ্রম থেকে মিছিল শুরু হয়। মেইন রোড ধরে পোস্ট অফিস মোড়ের কাছে শেষ হয়। সেখানেই পথ সভা হয়। অন্যদিকে,পুঞ্চা ব্লকের লাখরা গ্রাম পঞ্চায়েতের উদ্যোগে ঐতিহাসিক পাকবিড়রা গ্রামেও মানভূম ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গভুক্তি স্মারকের কাছে উদযাপিত হয়। ১৯৫৬ সালের ২০ এপ্রিল পাকবিড়রা থেকে বঙ্গভুক্তি ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সামিল হয়ে এক হাজার পাঁচ জন পায়ে হেঁটে কলকাতা কলকাতা পর্যন্ত পদযাত্রা করেছিলেন। কলকাতায় পৌঁছান ৬ মে।  ঐতিহাসিক আন্দোলন ভূমি পাকবিড়রাতে প্রচুর মানুষ জেলার জন্মদিবস উদযাপনে অংশ নিলেন এদিন। লোক সেবক সংঘের সচিব সুশীল মাহাতো বলেন,  “ভাষা সেনানীদের মর্যাদার দাবি জানিয়ে আসছি সরকারের কাছে। বঙ্গভূমির এই উদযাপন সেনানীদের প্রতি উৎস্বর্গ করছি আমরা।” পুরুলিয়ার বঙ্গভুক্তির রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। এই অন্তর্ভুক্তির জন্য জেলাবাসীকে দীর্ঘ আন্দোলন করতে হয়। মানভুম জেলার বিরাট অংশ ছিল বাংলাভাষী। তাঁরাই পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৪৮ সাল থেকে টানা আট বছর সমানে চলে এই ভাষা আন্দোলন। বঙ্গভুক্তির  দাবীতে ১৯৫৬ সালের ২০ এপ্রিল পুরুলিয়ার পাকবিড়রা থেকে কলকাতা পর্যন্ত পদযাত্রা করেন এক হাজারেরও বেশি নারী পুরুষ। একই  দাবীতে লোক সেবক সংঘ তৎকালীন ভাষা কমিশনের কাছে পেশ করেছিল ১৪টি ট্রাঙ্ক ভর্তি নথি। যার মধ্যে ছিল বাংলায় লেখা প্রাচীন পুথি পত্র, দলিল এবং বিভিন্ন চিঠি। বিপুল পরিমান এই নথিপত্র এবং দস্তাবেজ দেখার পর সারা মানভুম জেলা ঘুরে দেখেন ভাষা কমিশনের সদস্যরা। মানভুমের বড় অংশ  বাংলাভাষী অঞ্চল নিশ্চিত হয়ে তারা তৎকালীন মানভুম জেলার মোট ৩১টি থানার মধ্যে ১৯ টিই পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেন। পরে  অবশ্য মাত্র ১৪ টি থানাকে পচিম বঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।  বাংলাভাষী এই অঞ্চল পুরুলিয়া জেলা হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকে প্রতি বছর ১ নভেম্বর পুরুলিয়া জেলার জন্মদিন হিসেবে পালন করা হয়।  পুরুলিয়ার ভাষা আন্দোলনের উজ্বল ইতিহাস সারা রাজ্যের নবীন প্রজন্মকে জানানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে দাবী করেন লোকসেবক সংঘের সচিব প্রবীণ সুশীল মাহাতো। তিনি বলেন, “উপেক্ষা জুটেছে পুরুলিয়ার।  প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরে এই বিষয়কে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।  তিনি আক্ষেপ করেন পুরুলিয়া ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস যতটা গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল তা পায়নি।পুরুলিয়া জেলার  লোক গবেষকরা জানান, ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে এপ্রিল মাসে সুবে বাংলাকে ভাগ করে তৎকালীন ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি।  এর একটির রাজধানী ছিল কোলকাতা। অন্যদিকে বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে হয় অন্য একটি সুবা। যার রাজধানী করা হয় পাটনা। গোটা মানভুমকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় নতুন এই প্রদেশে। মানভুম জেলার সিংহভাগ মানুষ ছিলেন বাংলাভাষী। এই ভাবে বাংলা থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন তাঁরা। তবে সেসময় স্বাধীনতা আন্দোলন মুখ্য হয়ে যাওয়ায় এই আন্দোলনের  গুরুত্ব  কমে যায়। ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব বলেছিলেন দেশ স্বাধীন হবার পরই এই সমস্যা মিটিয়ে ফেলা হবে।  স্বাধীনতার পর মানভুম বিহার রাজ্যের অন্তর্গত হয়ে যায়। বিহার সরকার মানভুমের জনগণের উপর জোর করে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেয়। শুরু হয় প্রতিবাদ। ভাষা আন্দোলনে এগিয়ে আসেন মানভুম জননী লাবণ্যপ্রভা দেবী। পুরুলিয়ার বঙ্গভুক্তি আন্দোলনে বহুবার কারাবরণ করেন তিনি।

LEAVE A REPLY